ফলে সরকারিভাবে দাম সমন্বয় না হলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাড়তি ক্রয়ের চাপে দেশে পরিশোধিত ভোজ্যতেলের বাজার অস্বাভাবিক বেড়েছে। মূলত খোলা পর্যায়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল কেজিপ্রতি নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৩০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে পাইকারি বাজারে খোলা ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এ কারণে বিভিন্ন হাত ঘুরে খুচরায় গিয়ে তেলের দাম বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে সংকট আতঙ্ক শুরু হলে বাজার আরো বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর ভোজ্যতেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে। ওই সময় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে ১৯৫ টাকা, ৫ লিটারের দাম ৯৫৫ টাকা, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা এবং প্রতি লিটার খোলা পাম অয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয় ১৬৬ টাকা। ৮ ডিসেম্বর থেকে ওই পরিবর্তিত দাম সারা দেশে কার্যকর হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি মাসে বৈশ্বিক বুকিং দর ও আমদানি পর্যালোচনা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি কিংবা কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অনুমোদন দেয়। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি কিংবা কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যার কারণে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও মূল্য সংশোধন না হওয়ায় বোতলজাত সয়াবিনের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। কিন্তু খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা কঠোর না হওয়ায় পণ্যটির দাম মিলগেট ও পাইকারি বাজারে বেড়ে গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ ফেব্রুয়ারি অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে। ওই সময়ে সয়াবিনের টনপ্রতি দাম ২ দশমিক ৮৬ ডলার বেড়ে ১ হাজার ১৭১ দশমিক ৬৪ ডলারে লেনদেন হয়েছে বিশ্ববাজারে। দুই মাস আগেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১০০ ডলারের মধ্যে। এক বছর আগে একই মানের সয়াবিনের বৈশ্বিক দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৭৬ দশমিক ০৮ ডলার।
আমদানিকারকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাম সমন্বয় করতে পারেনি। বিশেষত জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী রমজান মাসের কারণে আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে চাপও দেয়া হয়নি। অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভোজ্যতেল পরিশোধনের খরচ বেড়ে গেছে। এ কারণে বোতলজাত সয়াবিনের দাম না বাড়লেও খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে পাইকারি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পূর্বের ক্রয় করা এসও (সরবরাহ আদেশ) লেনদেনের মাধ্যমে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি পিঙ্ক শিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর অপরিশোধিত সয়াবিনের টনপ্রতি দাম ছিল ১ হাজার ১১৬ ডলার (মাসব্যাপী গড় দাম)। জানুয়ারি মাসে গড় দাম ছিল ১ হাজার ১৫৪ ডলার এবং ফেব্রুয়ারিতে দাম আরো বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৭০ ডলার। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে বা তিন মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম বেড়েছে ১৫৪ ডলার। প্রায় তিন মাস আগের আমদানি হওয়া সয়াবিন বর্তমানে দেশের বাজারে পরিশোধিত হয়ে বাজারজাত হওয়ায় খোলা সয়াবিনের ক্ষেত্রে বাড়তি দাম রাখছে আমদানিকারক মিল মালিকরা। তবে সরকারিভাবে দাম পুনর্নির্ধারণ না হওয়ায় বোতলজাত সয়াবিনে আগের দাম রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে সয়াবিনের পাশাপাশি পাম অয়েলের বাজারও অস্থির হয়ে উঠেছে পাইকারি পর্যায়ে। ১০ দিন আগেও পাইকারিতে প্রতিমণ পরিশোধিত খোলা পাম অয়েলের দাম ছিল ৫ হাজার ৮৫০ থেকে ৫ হাজার ৮৮০ টাকায়। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পাশাপাশি সয়াবিনের দাম বৃদ্ধিতে পাম অয়েলের বাজার মণপ্রতি প্রায় ১৬০-১৭০ টাকা বেড়ে সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৫০ টাকায়। সয়াবিনের পাশাপাশি পাম অয়েলের বাজারও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা গেছে, সয়াবিনের পাশাপাশি অপরিশোধিত পাম অয়েলের দামও বেড়েছে। বিশ্ব বাজারে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে টনপ্রতি পাম অয়েলের দাম ছিল ৯৮০ ডলার। চলতি বছরের জানুয়ানিতে দাম আরো বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫ ডলার এবং সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিজুড়ে পাম অয়েলের দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৪২ ডলার। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ৬২ ডলার।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম বেড়েছে এটা সত্য। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আলোচনা না করায় আমদানিকারকরা বোতলজাত সয়াবিনের দাম না বাড়িয়ে মিলগেট থেকে সরবরাহ করা খোলা তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বাজারে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে দেশব্যাপী যেভাবে ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ে অস্থিতিশীলতা হয়েছিল সেটি এখনো ঘটছে।’ বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে ভোজ্যতেলের পাইকারি ও খুচরা বাজার অস্থির হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দাম অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে সয়াবিনের দাম বৃদ্ধি সত্ত্বেও গত তিন মাসে পণ্যটির দাম সমন্বয় হয়নি। সরকারি সব সংস্থা আমদানিকারকদের সব নথিপত্র নিয়মিত সংগ্রহ করছে। নির্বাচন, রমজানসহ বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ীরাও ভোক্তাদের স্বার্থে সরকারের কাছে চিঠি দেয়নি।’ দাম সমন্বয় না হলে দেশে ভোজ্যতেলের বাজার ফের অস্থিরতার মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ভোজ্যতেল আমদানি ও পরিশোধনে খরচ বেড়ে গেছে। এ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আমদানিতে শুল্ক ছাড় কিংবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে দাম সমন্বয় না করলে দেশে আমদানি কমে যাবে, যা আগামীতে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকটসহ এ নিত্যপণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলেও দেশে সমন্বয় না হওয়ায় আমদানিকারকরা বাড়তি দাম নিতে ব্যর্থ হয়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এ কারণে খোলা তেলের চাহিদা কারণে দাম আরো বেশি বেড়ে যায়। এখনো অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্র্যান্ডের সয়াবিনের বোতল কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সরবরাহ করছে না। ফলে বাজারে সয়াবিনের কৃত্রিম সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিনের বাজার ধারাবাহিকভাবে বাড়বে বলে শঙ্কা জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবাসয়ীরাও।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, দুই মাস আগে দেশের বাজারে প্রতিমণ পরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল ৬ হাজার ৭৫০ থেকে ৬ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে। এ সময়ে বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এসও এর দাম বেড়ে মণপ্রতি ৭ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের আন্তর্জাতিক সংকটকে পুঁজি করে সয়াবিনের দাম মণপ্রতি অন্তত ১৬০ টাকা বেড়ে ৭ হাজার ১৬০ টাকায় উঠে গেছে। ধারাবাহিকভাবে দাম বৃদ্ধি পেয়ে বাজার আরো অস্থির হওয়ার শঙ্কা জানিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।